ইসলামিক জীবন যাপন


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামীনের যিনি আমাদের জন্য দীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন আল্লাহ মানবকূলকে সর্বোৎকৃষ্ট জীবন ধারায় চলার জন্য একমাত্র সঠিক এবং পূর্নাঙ্গ ধর্ম ইসলাম দান করেছেন।

দুনিয়ার সকল মানুষ চায় সুখ, শান্তি, সফলতা। চাই সে মুসলমান হোক, চাই সে খৃস্টান হোক, চাই সে ইয়াহুদী হোক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবী চায়। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা ও সকল মানুষকে সুখ, শান্তি ও সফলতা দিতে চান। কিন্তু কেন মানুষ সফলতা পাচ্ছে না? ইহার একমাত্র কারণ আল্লাহ যে পথে কামিয়াবী দিতে চান, মানুষ সে পথে কামিয়াবী হাসিল করতে চায় না, মানুষ সে পথ অবলম্বন করতে চায় না। মানুষ চায় ভিন্ন পথে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জণ করতে। তাই মানুষ শত চেষ্টা করেও দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবী হাসিল করতে পারে না। হ্যাঁ, সেসব মহান ব্যক্তিরা যারা আল্লাহ তাআলার দেখানো পথ অবলম্বন করে তাঁরা উভয় জাহানেই কামিয়াব হন।

প্রকৃত সফলতা কি? প্রকৃত সফলতা হচ্ছে মানুষের মনের আশা আকাঙ্খা পরিপূর্ণ হওয়া। প্রকৃত সফলতা সেটাই যে সফলতার ক্ষয় নেই, লয় নেই, ধ্বংস নেই, জিল্লতি নেই। অর্থাৎ যে সফলতা চিরঅটুট, চিরস্থায়ী সেটাই প্রকৃত সফলতা, আসল সফলতা। বাস্তবে মানুষের কোন আশাই দুনিয়াতে পরিপূর্ণ হতে পারে না। এটা সম্ভবও নয়। মনের আশা সম্পূর্ণ রূপে পূর্ণ হবে জান্নাতে। দুনিয়ার যত সফলতা আমরা দেখি সবই ক্ষণস্থায়ী। আজ যে সুস্থ, কাল সে অসুস্থ। আজ যে যুবক, কাল সে বৃদ্ধ। আজ যে কোটিপতি, কাল সে ফকির। আজ যে বাদশাহ, কাল সে প্রজা। জান্নাতিদের সফলতা আসল সফলতা। সেখানে মানুষ বৃদ্ধ হবে না, চির যৌবন থাকবে। অসুস্থ হবে না, চিরকাল সুস্থ থাকবে। মৃত্যু হবে না, চির দিন বেঁচে থাকবে। জান্নাতিদের সৌন্দর্য হবে হযরত ইউসুফ (আঃ) এর মত। কণ্ঠস্বর হবে হযরত দাউদ (আঃ) এর মত। আখলাখ হবে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মত। আরও কত কি?

এই প্রকৃত সফলতা অর্জনের জন্য আল্লাহপাক মানুষের জীবন যাপনের জন্য এক বিধান রেখেছেন, আর তা হচ্ছে ইসলামিক জীবন বিধান বা দীন। একমাত্র ইসলামিক জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন যাপনের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা উভয় জাহানে মানুষের সুখ, শান্তি ও কামিয়াবী রেখেছেন। অন্য কিছুর মধ্যে নয়। তাই উভয় জাহানের কামিয়াবীর জন্য ইসলামিক জীবন বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করতে হবে। যাকে বলা যেতে পারে পুর্নাঙ্গ ইসলামিক জীবন যাপন। কোন মুসলমান যখন রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা তার সকল কাজকর্ম আল্লাহপাকের হুকুম এবং নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরিকা অনুযায়ী সম্পাদন করবে তখন তার সবটাই বন্দেগী হবে, আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য হবে।

ইসলাম একটি শান্তিময় জীবন ব্যবস্থা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল করার পূর্বেই আল্লাহ রব্বুল আলামীন এই দীনকে মুসলমানদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিয়েছেনএকজন মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম পরিপূর্ন বিধান প্রদান করেছে মানুষের জন্ম থেকে কবর পর্যন্ত এমন কোন কর্মকান্ড নেই যার দিকনির্দেশনা ইসলামে নেই।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সকল যুগের সব মানুষের জন্য উপযুক্ত জীবন ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করে কোন পথে চললে মানুষের কল্যাণ হবে, আর কোন পথে চললে অকল্যাণ হবে তা অহীর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেনসেই অহী তথা জীবন বিধানের নাম হচ্ছে আল ইসলাম মহান স্রষ্টা আল্লাহর বাণী ও হিদায়াত এবং সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষায় মানুষের জীবনে চলার কোনো বিষয়ই অনুপস্থিত নেইমহাগ্রন্থ আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হওয়ার পক্ষে সমর্থন ঘোষণা করা হয়েছে

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার নেআমত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসাবে মনোনীত করলাম। - সুরা মায়েদা, আয়াতঃ ০৩।

আল্লাহ তাআলা আরও ফরমানঃ "নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকটে একমাত্র মনোনীত দীন হল ইসলাম। -সুরা আল ইমরান, আয়াতঃ ১৯

এ সমস্ত আয়াত প্রমাণ করে যে, রসূলুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশাতেই অহির বিধানের মাধ্যমে দীন-ইসলাম পূর্ণতা লাভ করেছে, যাতে মানুষের সার্বিক জীবনের সকল দিক ও বিভাগ পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণিত হয়েছেআল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ আমি এই কিতাবে (কোরআনে) কোন বিষয়ই লিপিবদ্ধ করতে ছাড়িনিসুরা আনআম, আয়াতঃ ৩৮

তিনি অন্যত্র ফরমানঃ আর আমরা আপনার উপরে প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা স্বরূপ কিতাব (কোরআন) নাযিল করেছিসুরা নাহল, আয়াতঃ ৮৯অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আমার উট বাঁধার একটি দড়িও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে আমি তা আল্লাহর কিতাবের মধ্যে খুঁজে পাব

অতএব, বুঝা গেল, মহান আল্লাহ কোরআনকে আমাদের নিকট পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান হিসাবে প্রেরণ করেছেন এবং তাকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী ও রসূল করে পাঠিয়েছেনআর তিনিও আল্লাহ তাআলার বিধানের যথাযথ বাস্তবায়ন করেছেনএক্ষেত্রে সামান্যতম ত্রুটি করেননিযেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ ফরমানঃ আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এমন কোন জিনিসই আমি (বর্ণনা করতে) ছাড়িনিআর আমি তাঁর হুকুম তোমাদেরকে অবশ্যই দিয়েছিআর আমি এমন কোন জিনিসই ছাড়িনি যা আল্লাহ তাআলা নিষেধ করেছেনকিন্তু আমি তোমাদেরকে তা অবশ্যই নিষেধ করেছি

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম। সুরা মায়েদা, আয়াতঃ ০৩ সুতরাং সে যুগে (রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগ) যা দীন হিসাবে গণ্য ছিল না, বর্তমানেও তা দীন হিসাবে পরিগণিত হবে না

সুতরাং বিশ্বাস, কথা ও কর্মে একমাত্র অহির বিধানের কাছেই আত্মসমর্পণ করতে হবে আল্লাহর বিধানের পরিপন্থি মানব রচিত কোন বিধানকে কখনোই অনুসরণ করা যাবে নাএকমাত্র মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনিত দীনের উপর চলতে হবে। আল্লাহপাক ইরশাদ ফরমানঃ তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। -সুরা আহযাব, আয়াতঃ ২১

তিনি অন্যত্র বলেনঃ রসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকেই ভয় করনিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর। -সুরা হাশর, আয়াতঃ ০৭

ইসলামী জীবনাদর্শের বুনিয়াদ হচ্ছে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহলা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেইঘোষণাটি হচ্ছে ইসলামী আকীদার প্রথম স্তম্ভ এ অংশে আল্লাহ ছাড়া বন্দেগীর যোগ্য কেহ নেই -একথার স্বীকৃতি রয়েছেমুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রসূল। ইহা ইসলামী আকীদা বা কালেমায়ে শাহাদাতের দ্বিতীয় অংশএ অংশে আল্লাহ তাআলার বন্দেগী করার জন্যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ প্রদর্শিত পন্থাই সঠিক বলে মেনে নেয়া

এ কালেমার উল্লেখিত দুটো অংশই প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে বদ্ধমূল হতে হবেকারণ, ঈমানের অপরাপর বিষয় ও ইসলামের পরবর্তী স্তম্ভগুলো এ ঘোষণারই পরিণতিস্বাভাবিকভাবেই ফেরেশতা, আসমনী কিতাব, নবীগণ (আ), আখিরাত, তাকদীরের ভাল-মন্দ, মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ইত্যাদি বিষয়ের প্রতি ঈমান আনয়ন এবং নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ, হালাল ও হারাম, ব্যবসা-বানিজ্য, লেনদেন, আইন-কানুন, আদেশ-উপদেশ, সামাজিক আচার-আচরণ ইত্যাদি সকল কাজকর্মই আল্লাহ তাআলার বন্দেগী হবে যখন তা আল্লাহপাকের হুকুম এবং রসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে

মানব জীবনের সকল অবস্থায় অর্থাৎ তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত অনুসরণ এবং অনুকরণ করতে হবে যেমন আল কোরআনে বলা হয়েছেঃ

রসূল তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে তোমরা বিরত থাক -সুরা হাশর, আয়াতঃ ০৭

আল্লাহ তাআলা মহা-গ্রন্থ কোরআনুল করীমে ইরশাদ করেনঃ আদেশ দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহরতিনিই আদেশ করেছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারো বন্দেগী করা চলবে নাআর এটাই হচ্ছে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত জীবন বিধান -সুরা ইউসুফ, আয়াতঃ ৪০।

ইসলাম কেবলমাত্র একটি ধর্মের নাম নয়ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেনঃ আল্লাহর নিকট একমাত্র জীবন বিধান হচ্ছে আল ইসলাম-সূরা আল ইময়ান, আয়াতঃ ১৯।

মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক. রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক তথা মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ও বিভাগে ইসলামের সুষ্পষ্ট বিধান রয়েছেরসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই বিধানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি একদিকে যেমন মসজিদের ইমাম ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি ছিলেন রাষ্ট্রপতি, সেনাপতি. বিচারপতি আল কোরআন ও আল হাদীসে ইসলামী জীবন বিধান সংরক্ষিত রয়েছে যারা ইসলামকে জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করে সেই বিধান অনূযায়ী জীবনযাপন করে তাদেরকে বলা হয় মুসলিমএকজন মুসলমান কখনো ইসলাম ছাড়া অন্য কোন মত ও পথকে গ্রহণ করতে পারে নাআল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেনঃ তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা কিছু নাযিল হয়েছে তা মেনে চলো, তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারো অনুসরণ করো না -সূরা আল আরাফ, আয়াত: ০৩

সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সে যে আমল বা কাজ করবে সে সম্পর্কে শরীআত কি বলে তা জানা অপরিহার্য। কারণ ইলম ব্যতীত আমল আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য নয়।

আসুন আমরা সবাই চেষ্টা করি ইসলামি শরীআত মোতাবেক চলাফেরা করার।

 

#Collected

 

Comments